
বিদায়ী ২০২৫ সালটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল এক অনিশ্চয়তা, উত্তাপ, পরিবর্তন ও প্রত্যাশার বছর। বছরের শুরু থেকেই মূল আলোচনায় ছিল—কবে হবে জাতীয় নির্বাচন? অবশেষে বছরের শেষভাগে এসে ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হয়, পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও আসে।
বছরের প্রথম অর্ধেক কেটেছে সংস্কার ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আলোচনায়। এরপরের সময়জুড়ে নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি, জোট রাজনীতি, নতুন দলের উত্থান এবং রাজনৈতিক সহিংসতা মিলে রাজনীতিতে তৈরি হয় নতুন সমীকরণ। বছরের শেষ সময়টায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন যেমন আলোড়ন তোলে, তেমনি বছরের বিদায়ী মুহূর্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের।
জুলাই সনদ ও গণভোট: সংস্কারের নতুন অধ্যায়
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশন ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে।
১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় “জুলাই সনদ”। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে সরকার গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বোঝা যায়, সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার রাজনীতিও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
নতুন রাজনীতির বার্তা: এনসিপির আত্মপ্রকাশ
বছরজুড়ে আলোচিত ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ নেতৃত্বের রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পুরোনো রাজনীতির বাইরে নতুন ধারার রাজনীতি গড়ার অঙ্গীকার ছিল তাদের মূল বার্তা। তবে নির্বাচন সামনে রেখে জোট রাজনীতি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতা অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করে। ফলে শাপলা কলি প্রতীকের ভবিষ্যৎ জনপ্রিয়তা কতটা—তা নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলের ওপর।
ওসমান হাদি হত্যা: রাজনীতিতে উত্তাপ
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ, অবরোধসহ রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ে। এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সহিংসতার নতুন মাত্রা যুক্ত হয় রাজনীতিতে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: বিএনপিতে নতুন উদ্দীপনা
১৭ বছর পর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণশক্তি যোগায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর প্রত্যাবর্তন বড় রাজনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে মূল্যায়িত হয়। তাঁর নেতৃত্বেই দলটি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
বিদায় খালেদা জিয়া: এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি
দীর্ঘ অসুস্থতার চিকিৎসা শেষে ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি হয়ে রাজনীতিতে এসে তিনি গণভিত্তি, আন্দোলন ও নেতৃত্বের শক্তি দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে। তাঁর মৃত্যু শুধু বিএনপির জন্য নয়, জাতীয় রাজনীতির জন্যও বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণের বছর—
সংস্কারের স্বপ্ন, সহিংসতার ভয়, নতুন শক্তির উত্থান, পুরোনো নেতৃত্বের বিদায় এবং সামনে থাকা নির্বাচনের অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলেই বছরটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটই এখন নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা ও স্থিতিশীলতা।
যদি আপনি চান, আমি এটিকে সম্পূর্ণ ফিচার রিপোর্ট, সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ বা সংবাদ ধারাবাহিকের প্রথম পর্বের মতোও সাজিয়ে দিতে পারি।