
বাংলাদেশ বর্তমানে তার অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশটি একদিকে যেমন উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি, অন্যদিকে তেমনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি ও কাঠামোগত সংস্কারের চাপও মোকাবিলা করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বছর শেষে দেশের নোমিনাল জিডিপির আকার ৫১০ থেকে ৫১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পূর্ববর্তী কয়েক বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কম, তবুও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। চলতি বছরের শুরু থেকেই খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৫৮ থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার তদারকি বৃদ্ধি এবং কার্যকর মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখতেও এই রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিল্প খাতেও ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগে এখনও কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো গেলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও উন্নত হতে পারে।
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করবে। এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক ক্রেডিট রেটিং বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে একই সঙ্গে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলডিসি উত্তরণের পর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে জিএসপি প্লাস সুবিধা ধরে রাখতে কার্যকর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য এক রূপান্তরমুখী সময়। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পথচলা। সঠিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী সংস্কার এবং কার্যকর নীতিনির্ধারণই পারে বাংলাদেশকে একটি আরও শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে।