
রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা ও আগামীর পথ
মোহাম্মদ মুজাহিদঃ
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়েই গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারার পরিবর্তে আমরা যেন ক্রমেই প্রবেশ করছি অবিশ্বাস, মেরুকরণ এবং পারস্পরিক অসহিষ্ণুতার এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গে।
এক সময় রাজনীতি ছিল আদর্শ, দর্শন ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা। এখন তা অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার যুদ্ধে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ শালীনতা হারাচ্ছে, যুক্তির জায়গা দখল করছে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি, আর সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে আস্থা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের টানাপোড়েন। নির্বাচন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা কিংবা নীতি নির্ধারণ যে ক্ষেত্রেই তাকানো হোক, নিরপেক্ষতার প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে। যখন নাগরিকরা মনে করতে শুরু করে যে খেলার মাঠ সমান নয়, তখন গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; প্রাণশক্তি হারায় অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি।
রাজনীতির এই ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ সমাজকেও দুই ভাগে ঠেলে দিচ্ছে। মতভেদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, কিন্তু শত্রুতা গণতন্ত্রের শত্রু। আজ মতের পার্থক্য যেন সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করছে। বন্ধু, সহকর্মী, এমনকি পরিবারের মধ্যেও। এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নীতি অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, আর রাজনৈতিক টানাপোড়েন উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ধীর করে দেয়। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। যারা রাজনীতির দর্শক নয়, বরং এর প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একটাই সংলাপ, সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর বুঝতে হবে, গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়; বরং বিকল্প মতের প্রতিনিধিত্বকারী। আর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা দলীয় নয়, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো একমুখী নয়; এটি এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দুটি পথ একটি আরও মেরুকরণ ও অনাস্থার, অন্যটি সমঝোতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের। কোন পথে দেশ যাবে, তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি এবং নাগরিকদের সচেতন চাপ।
সময় এখন স্পষ্ট সিদ্ধান্তের রাজ

নীতি কি ক্ষমতার খেলা হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের উপর দাঁড়ানো এক পরিণত গণতন্ত্রে রূপ নেবে?