
পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম দিনেই সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নলতা শরীফে শুরু হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ইফতার মাহফিল। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রথম দিনের আয়োজন রূপ নিয়েছে এক অনন্য মিলনমেলায়। নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছরের মতো এবারও মাসব্যাপী এই বিশাল ইফতার কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
ভোর থেকে ব্যস্ততা, বিশাল প্রস্তুতি
প্রথম রোজার দিন ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় ইফতার প্রস্তুতির ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। ফজরের নামাজের পর প্রায় ৩০–৩৫ জন দক্ষ বাবুর্চি ও সহকর্মী রান্নাঘরে কাজে নেমে পড়েন। বিশাল ডেগে ছোলা সিদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, ফিরনি রান্না, সিংগাড়া ভাজা, চিড়া, খেজুর ও কলা সাজানো—সব মিলিয়ে এক ব্যস্ত আয়োজন। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার সিংগাড়া তৈরি করা হয়। রান্নার কাজ চলে টানা প্রায় ১০ ঘণ্টা, যাতে মাগরিবের আগেই সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে পরিবেশন করা যায়।
স্বেচ্ছাসেবকদের নিবেদিত অংশগ্রহণ
ইফতার বণ্টন কার্যক্রমে অংশ নেন প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক। তারা সারিবদ্ধভাবে বসা রোজাদারদের সামনে পানির পট ও গ্লাস পৌঁছে দেন। এরপর সাজানো প্লেটে সিংগাড়া, ছোলা, ডিম, ফিরনি, চিড়া, কলা ও খেজুর পরিবেশন করা হয়। মাগরিবের আজান ধ্বনিত হতেই হাজারো মানুষ একসঙ্গে ইফতার গ্রহণ করেন, যা উপস্থিত সকলের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা হজরত খানবাহাদুর আহছানউল্লা (রহ.) ১৯৩৫ সালে মিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের আয়োজনের সূচনা করেন। ১৯৫০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এ আয়োজন চলছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ এখানে একসঙ্গে ইফতার করেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের আর্থিক সহযোগিতায় এই বিশাল আয়োজন পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ইফতারের পর দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতি
দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে সিংগাড়া তৈরির কাজে যুক্ত বাবুর্চি মোঃ মুক্তার হোসেন বলেন, “এই ইফতার মাহফিল শুধু খাবার বিতরণ নয়, এটি আমাদের কাছে ইবাদতের অংশ। প্রতিদিন হাজারো মানুষের জন্য কাজ করতে পারা আমাদের জন্য গর্বের।”
কর্মী আসাদুর রহমান জানান, “রমজানজুড়ে এই কাজ করতে পারা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। ক্লান্তি থাকলেও মানুষের সন্তুষ্টি দেখলেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।”
ইফতারে অংশ নেওয়া শিক্ষক আবু হাসান বলেন, “একসঙ্গে ছয় হাজার মানুষের ইফতার—এটি সত্যিই বিরল দৃশ্য। এখানে অংশ নিতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। মহান আল্লাহ যেন আমাদের ইফতার কবুল করেন।”
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত
প্রতি বছর এই বিশাল ইফতার আয়োজন নলতা শরীফকে পরিণত করে এক মহামিলনস্থলে। সাতক্ষীরা ছাড়াও খুলনা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। ধর্মীয় অনুভূতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সংহতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে এই ইফতার মাহফিল দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হিসেবে পরিচিত।
রমজানের প্রথম দিনেই এমন সুশৃঙ্খল ও ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে—নলতা শরীফের এই ইফতার মাহফিল শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় করার এক মহৎ প্রয়াস।