
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজার থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি)-এর যৌথ গবেষণায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণার সন্ধান মিলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলে দূষণের মাত্রা অন্তত ১.২৪ গুণ বেশি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এ গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করে আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায় দূষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। শিল্পকারখানার আধিক্য, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল কারখানার নিকটবর্তী অবস্থান এবং একই পাত্র বারবার ব্যবহারের কারণে এ দূষণ বাড়ছে বলে গবেষকদের ধারণা।
বিশ্লেষণে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে—লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) ও নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে এবারই প্রথম কোনো গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত কণার ৮২.৫ শতাংশ ছিল আঁশজাতীয় এবং অধিকাংশের আকার ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭.৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি—প্রতিদিন গড়ে ৭৭.২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা। একটি শিশু জীবনদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে বলেও গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের পরিপাকতন্ত্র, হরমোনের ভারসাম্য, প্রদাহ এবং কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে সক্ষম।
গবেষণা দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান দূষক, যা মানবদেহের প্রজনন ও বিপাকীয় ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে কঠোর নজরদারি এবং খোলা তেল বিক্রিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উল্লেখ্য, এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় দেশের বাজারে প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।