July 25, 2026, 9:37 pm

বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য, মেসির শিকড়ের সন্ধান মিলল

অভয়নগর প্রতিবেদক

স্পেনের বার্সেলোনায় ফুটবল ক্যারিয়ারের উত্থানটা ঘটেছিল লিওনেল মেসির। সেই সূত্র ধরে বিশ্বকাপ চলাকালে স্প্যানিশ গণমাধ্যমের আলোচনায় ছিল– মেসিকে নিজেদের দলে পাওয়ার সুযোগ ছিল স্পেনের। কেবল তারাই নয়, টানা তিনবার বিশ্বকাপ খেলতে না পারা চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালিও চাইলে এই আক্ষেপ করতে পারে। এবার জানা গেছে, ব্রাজিলেও কারও কারও এখন মেসিকে না পাওয়ার অতৃপ্তি কাজ করছে!

ইতালির ইতিহাসবিদ ও পেশায় ব্যাংকার ফিওরেঞ্জো সান্তিনি মেসির পারিবারিক বংশতালিকা অনুসন্ধান করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে উঠে এসেছে– মেসির এক প্রপিতামহ (দাদার বাবা) ব্রাজিলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। মূলত পারিবারিক পদবি ‘কুচ্চিত্তিনি’র সূত্র ধরেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে আর্জেন্টাইন মহাতারকার সংযোগ পাওয়া গেছে।

ফুটবলপ্রেমী সান্তিনি প্রথমে মেসির ইতালীয় শিকড় অনুসন্ধান করেন। তিনি জানতে পারেন, মেসির পিতৃসূত্রের প্রপিতামহ অ্যাঞ্জেলো মেসি ইতালির মারকে অঞ্চলের মাচেরাতা প্রদেশের রেকানাতি শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৮৯৩ সালে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ইতালি ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে চলে যান। যা নিয়ে সান্তিনি বলেন, ‘আমি মেসির বাবার তথ্য সংগ্রহ করি এবং ২০১৫ সালে তাকে এই গল্প জানাই। কয়েক বছর পর তিনি আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে মেসির মায়ের দিকের বংশপরিচয়ও অনুসন্ধান করতে বলেন, যাতে ইতালীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা যায়।’

গবেষণা অনুযায়ী, মেসির মাতৃসূত্রের ইতিহাস শুরু হয় তার প্রপিতামহের বাবা রানিয়েরো কোচেত্তিনিকে দিয়ে। তার জন্ম ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহরে, যা মেসির পিতৃসূত্রের পরিবারের একই প্রদেশে অবস্থিত। রানিয়েরো স্ত্রী রোজা রিক্কেজ্জাকে নিয়ে ইতালিতে দুটি সন্তানের জন্ম দেন– জুলিয়া ও ফ্রাঞ্চেস্কো। পরে তারা ওয়াশিংটন নামের জাহাজে করে ব্রাজিলে পাড়ি জমান এবং ১৮৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সান্তোস বন্দরে পৌঁছান। সাও পাওলো রাজ্যের ইমিগ্রেশন মিউজিয়ামের ঐতিহাসিক নথিতে এই তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।

ব্রাজিলে পৌঁছানোর পর সরকারি নথিতে রানিয়েরো কোচেত্তিনির নাম পরিবর্তিত হয়ে রামিয়েরো কনচেত্তিনি হয়ে যায়। সে সময় বানান ও উচ্চারণগত জটিলতার কারণে অভিবাসীদের নাম-পরিচয়ে এ ধরনের পরিবর্তন ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। ঐতিহাসিক নথিতে রামিয়েরোকে একজন কৃষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাও পাওলোর রিনকাও এলাকায় ড. মার্তিনহো প্রাদো জুনিয়রের একটি খামারে কাজ শুরু করেন, যা রিবেইরাও প্রেতো থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে।

রিবেইরাও প্রেতো অঞ্চলে বসবাসের সময় রামিয়েরো ও রোজার ঘরে আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। সান সেভেরিনো মার্কে পৌরসভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেন এরমিনিয়া এবং ১৯০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি জন্ম নেন আরদেরিগো। গবেষক ফিওরেঞ্জো সান্তিনির মতে, মেসির ব্যবহৃত কুচ্চিত্তিনি পদবির উৎপত্তি আরদেরিগোর মাধ্যমেই। রিবেইরাও প্রেতোতে জন্মনিবন্ধনের সময় তার নাম পরিবর্তন করে ফেদেরিকো এবং কোচেত্তিনি পদবিও বদলে কুচ্চিত্তিনি হয়ে যায়। সান্তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলে আরদেরিগো হয়ে যায় ফেদেরিকো। আর কোচেত্তিনি বদলে হয় কুচ্চিত্তিনি। এই ফেদেরিকোই মেসির প্রপিতামহ।’

ফেদেরিকোর জন্মের এক বছর পর পুরো পরিবার ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনায় চলে যায়। ১৯০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা সেখানে পৌঁছে রোজারিও অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখানেই পরবর্তীতে জন্ম নেন মেসির নানা আন্তোনিও কুচ্চিত্তিনি, মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি এবং এরপর ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। অর্থাৎ তার প্রপিতামহের আর্জেন্টিনায় আগমনের ৮২ বছর পর জন্ম হয় মেসির।

বিশ্বকাপজয়ী মেসির সঙ্গে মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনির একটি ছবিও ব্রাজিলের গণমাধ্যম গ্লোবোর প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। সেলিয়া হচ্ছেন ব্রাজিলে ১৯০৪ সালে জন্ম নেওয়া ফেদেরিকোর নাতনি। সান্তিনি জানান, মূলত কুচ্চিত্তিনি পদবিই তাকে মেসি ও ব্রাজিলের সম্পৃক্ততার সন্ধান দেয়। কারণ ইতালিতে এই পদবির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় নিয়ে মেসির মাতৃসূত্রের পুরো পারিবারিক বংশতালিকা সাজিয়েছেন।

সান্তিনি বলেন, ‘গবেষণার সময় আমি দেখলাম ইতালিতে কুচ্চিত্তিনি নামে কোনো পদবি নেই। পরে মেসির মায়ের এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে নথি পাওয়ার পর বুঝতে পারি, ব্রাজিলে পৌঁছানোর পরই নাম ও পদবির পরিবর্তন করা হয়েছিল।’ সান্তিনির এই গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহর মেসিকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।

এদিকে, মেসির শিকড় নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর ব্রাজিলজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা রসিকতা। অনেকে মেসিকে ব্রাজিলের জার্সি পরিয়ে ছবি প্রকাশ করেন। আবার অনেকের মন্তব্য, এমন একজন কিংবদন্তি ফুটবলার যদি ব্রাজিলের হয়ে খেলতেন, তাহলে হয়তো টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ফাইনাল না খেলার আক্ষেপ করতে হতো না পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের!



ফেসবুক কর্নার