
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহন করা হলেও সেই বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি জাহাজের জ্বালানি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে ব্যবহৃত হেভি ফুয়েল অয়েল বা বানকার ফুয়েলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর দাম বাড়ছে। গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফুয়েল অয়েল রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। গড়ে প্রতিদিন রপ্তানির পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ব্যারেলে। একই সময়ে তেল পরিশোধনাগারগুলো জাহাজের জ্বালানির পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি লাভজনক ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে সরবরাহ কমার পাশাপাশি জাহাজের জ্বালানির চাহিদা ও দাম দুটিই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুথিদের হামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ চলাচলে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেও বাণিজ্যিক পরিবহনে চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি থেকেও ফুয়েল অয়েল রপ্তানি কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের জ্বালানি সরবরাহের ওপর একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বানকার ফুয়েল হাব সিঙ্গাপুরেও এর প্রভাব স্পষ্ট। দেশটি নিজস্ব ব্যবহারের জন্য প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল ফুয়েল অয়েলের অর্ধেকের বেশি আমদানি করে। সংঘাত শুরুর পর সিঙ্গাপুরে কম সালফারযুক্ত ভিএলএসএফও জ্বালানির দাম প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মেট্রিক টনের দাম প্রায় ৮২৫ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়াবে না, বরং পরিবহন খরচও বাড়িয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ পণ্য উৎপাদক ও ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে জাহাজের জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনাও সীমিত থাকবে। কারণ বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানে খুবই সীমিত।