
কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার মহাখালী রুটে পরিবহন মালিকদের বিরোধের জেরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ করে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দুই জেলার হাজারো যাত্রী। বিশেষ করে চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও জরুরি কাজে ঢাকায় যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ পড়েছেন বিপাকে। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে অনেককে বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করতে হচ্ছে। এতে যাত্রীদের সময় ও অর্থ—দুটিই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার মহাখালী রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে শনিবার (২৪ অক্টোবর) থেকেই দুই পক্ষের বিরোধের জেরে এ রুটে বাস চলাচল ব্যাহত হতে শুরু করে। পরিবহন মালিকদের মধ্যে নতুন বাস যুক্ত করা, পুরোনো বাস সরবরাহ এবং কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এ রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে পুরোনো বাস পরিবর্তন করে নতুন বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার পরিবহন মালিকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। তবে নতুন বাস যুক্ত করা এবং পুরোনো বাস সরবরাহের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরে কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও বিরোধকে আরও বাড়িয়ে দেয় কিশোরগঞ্জ–মহাখালী রুটে নতুন বাস যুক্ত করা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই দুই অঞ্চলের পরিবহন মালিকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিশোরগঞ্জের মালিকপক্ষের দাবি, রুটে চলাচলকারী পুরোনো বাস সরিয়ে নতুন বাস চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঢাকার মালিকপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।কিশোরগঞ্জের পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, তাঁরা পুরোনো বাস সরিয়ে নতুন বাস চালু করলেও ঢাকার মালিকপক্ষের বাস পরিবর্তন ও সরবরাহ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নতুন বাস যুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও আপত্তি দেখা দেয়। এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ ক্রমেই বাড়তে থাকে।অন্যদিকে, নতুন বাস যুক্ত করার প্রক্রিয়া, রুট ব্যবস্থাপনা এবং বাস সরবরাহের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।পরিবহন মালিকদের বিরোধের মধ্যে ঢাকায় কিশোরগঞ্জের পরিবহনগুলোর কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া এবং বাস সরবরাহ নিয়ে অসহযোগিতার কারণে তাঁরা সমস্যার মুখে পড়েছেন।কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক আনিসুজ্জামান বাবুল বলেন মহাখালী এলাকার পরিবহন মালিকদের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ চলছে। পুরোনো বাস সরবরাহ এবং কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সমস্যার সমাধান চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।পরিবহন মালিকদের এ বিরোধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান না হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তজেলা রুটে যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রতিদিন এ পথে যাতায়াতকারী মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার মহাখালী রুটে সাধারণত অনন্যা সুপার, অনন্যা ক্লাসিক, জলসিঁড়ি ও উজান-ভাটি পরিবহনের বাস চলাচল করে। পরিবহন মালিকদের বিরোধের কারণে এসব পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।এ রুটে অনন্যা সুপারের ৫০টি, অনন্যা ক্লাসিকের ৫৭টি, জলসিঁড়ি পরিবহনের ১০০টি এবং উজান-ভাটির ৩০টি বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩৭টি বাস বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।বাস চলাচল বন্ধ থাকায় কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটেছে। এ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের অনেকেই বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।রোববার সকালে গাইটাল বাস টার্মিনাল থেকে মহাখালীগামী বাস না ছাড়ায় যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। আগে থেকে বাস চলাচল বন্ধের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় অনেকেই টার্মিনালে এসে পরিস্থিতি জানতে পারেন। এরপর গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয়।ঢাকায় কর্মস্থলে যোগ দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, ব্যবসায়িক কাজ সম্পন্ন করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ রুটে যাতায়াত করেন। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় এসব কাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।বিশেষ করে যাঁদের নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো জরুরি, তাঁদের দুর্ভোগ বেশি। অনেক যাত্রীকে অন্য রুটে যাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজতে হচ্ছে। কেউ কেউ বিকল্প যানবাহনে যাত্রা করার চেষ্টা করছেন। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় ও ভাড়া লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাতায়াতকারী চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত মহাখালী রুটের বাসের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের দৈনন্দিন যাতায়াত পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে।চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কাজে অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বাস বন্ধ থাকার কারণে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হলে তাঁদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বের হতে হতে পারে।এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কাজেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষের কাছে এ রুটের বাস চলাচল শুধু পরিবহনসেবা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিশোরগঞ্জ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়া রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ক্ষেত্রেও বাস চলাচল বন্ধ থাকা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা হাসপাতালে যাওয়ার জন্য যাঁদের যাত্রা করার কথা, তাঁদের বিকল্প পরিবহন খুঁজতে হচ্ছে।জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের জন্য এমন পরিস্থিতি বিশেষভাবে সমস্যাজনক। কারণ, আগে থেকে যাত্রার পরিকল্পনা করা থাকলেও হঠাৎ পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা সব সময় সম্ভব হয় না।তবে এ ঘটনায় কতজন রোগী বা জরুরি যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, যাত্রীদের ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হওয়া।মহাখালী রুটে সরাসরি বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বিকল্প রুট ও যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হতে পারে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগীদের জন্য একাধিক যানবাহন পরিবর্তন করে গন্তব্যে পৌঁছানো কষ্টকর হতে পারে।কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার বিকল্প হিসেবে রেলপথসহ অন্যান্য সম্ভাব্য যাতায়াতব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যাত্রার আগে ট্রেনের সময়সূচি, আসনপ্রাপ্যতা এবং বিকল্প সড়কপথের বাস চলাচল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। মহাখালী রুট বন্ধ থাকার অর্থ এই নয় যে কিশোরগঞ্জের সব সড়কপথের বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে।এদিকে বিকল্প পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। বাস চলাচল বন্ধের সুযোগ নিয়ে কোনো পরিবহন যেন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি।কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক আনিসুজ্জামান বাবুল জানিয়েছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে রোববার দুপুর ১টায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় ডাকার কথা জানানো হয়েছিল।এ পরিস্থিতিতে কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার পরিবহন মালিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। নতুন বাস যুক্ত করা, পুরোনো বাস পরিবর্তন, বাস সরবরাহ, কাউন্টার পরিচালনা এবং রুট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হতে পারে।পরিবহন মালিকদের বিরোধের কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হওয়া কাম্য নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তজেলা রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকলে তার প্রভাব শুধু যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ে।যাত্রীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, জেলা প্রশাসন এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।যাত্রীসেবা স্বাভাবিক রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রুটে বাস যুক্ত করা, বাস পরিবর্তন এবং কাউন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে লিখিত সমঝোতা ও স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।কিশোরগঞ্জ–মহাখালী রুটে বাস চলাচল বন্ধের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। পরিবহন মালিকদের বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে তাঁদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে দ্রুত বাস চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি উঠেছে।এখন দেখার বিষয়, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের বিরোধ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং কবে নাগাদ এ রুটে স্বাভাবিক পরিবহনসেবা ফিরে আসে। যাত্রীদের প্রত্যাশা, মালিকপক্ষের বিরোধের সমাধান করে তাঁদের নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে।