August 10, 2026, 12:59 pm

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান: বাংলার মাটি ও মানুষের শিল্পী

সুমন ঘোষ ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি

বাংলার মাটি, মানুষ ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে তুলির আঁচড়ে অনন্য এক শিল্পভুবন সৃষ্টি করেছিলেন কালজয়ী চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান। তাঁর চিত্রকর্মে উঠে এসেছে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নদী-খাল, মাঠ-ঘাট এবং গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা নানা দৃশ্য। তাঁর শিল্পে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন পেয়েছে এক স্বতন্ত্র নান্দনিক ভাষা।

নড়াইল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর তীরবর্তী সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা মাছিমদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ এবং ঘামে ভেজা মেহনতি মানুষের জীবন হয়ে ওঠে শিল্পের অন্যতম প্রধান বিষয়।

সুলতানের চিত্রকর্মে গ্রামবাংলার নিত্যদিনের জীবন বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। পাট কাটা, ধান কাটা, ধান ঝাড়া, নৌকায় চলাচল, গ্রামের খাল, মাছ শিকার, গ্রামের দুপুর, নদী পারাপার, ধান মাড়াই, জমিতে চাষ দেওয়া, নদীর ঘাটে গোসল, ধান ভানা, গুন টানা, ফসল কাটার মুহূর্ত, শরতের গ্রামীণ জীবন ও শাপলা তোলার মতো অসংখ্য বিষয় তাঁর ছবিতে প্রাণ পেয়েছে।

তাঁর শিল্পকর্মে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী অবয়ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে তিনি কেবল দৃশ্য হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং তাঁদের শ্রম, শক্তি, সংগ্রাম ও সৌন্দর্যকে শিল্পের কেন্দ্রে স্থান দিয়েছেন। এ কারণেই এস এম সুলতানের শিল্পভুবন বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় তাঁর চিত্রকর্ম যৌথ প্রদর্শনীতে সমকালীন বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের কাজের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। ওই প্রদর্শনীতে পাবলো পিকাসো ও সালভাদর দালির মতো বরেণ্য শিল্পীদের কাজও ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর শিল্পকর্মের পরিচিতি তাঁকে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

১৯৭৬ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে এস এম সুলতানের একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিমনা সমাজে তিনি নতুনভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর শিল্পের নিজস্ব ভাষা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী অবয়ব এবং গ্রামীণ জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।

শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এস এম সুলতান। পরে নড়াইলে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

এস এম সুলতানের স্মৃতি ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণে নড়াইলে তাঁর নিজ বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও কমপ্লেক্স। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রকৃতিনির্ভর গ্রামীণ জীবনের এক শক্তিশালী দলিল হিসেবে শিল্পপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত।

বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনকে শিল্পের প্রধান উপজীব্য করে এস এম সুলতান যে স্বতন্ত্র শিল্পভাষা নির্মাণ করেছিলেন, তা তাঁকে বাংলাদেশের চারুশিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ছবিতে তাই শুধু রং ও রেখার সমন্বয় নয়—দেখা যায় বাংলার মানুষের জীবন, শ্রম, স্বপ্ন ও শিকড়ের গল্প



ফেসবুক কর্নার